PC Header Top Ads

Type Here to Get Search Results !

Display Responsive Ads

‘মনসবদার' কী?

মানসবদারি প্রথা সম্পর্কে আলোচনা করো।

মানসবদারি প্রথা টীকা।

মনসবদারি প্রথা ছিল একটি পারসিক প্রথা। আকবরের বহু পূর্বে মধ্য এশিয়ায় চেঙ্গিজ খাঁ ও তৈমুর লঙের শাসনব্যবস্থায়ও এই প্রথার প্রচলন ছিল। 


মোগল সম্রাট আকবর তাঁর শাসনকালে যে সকল শাসনতান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষা করেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল মনসবদারি প্রথার প্রচলন। ড. সতীশচন্দ্র মনে করেন যে, আকবর এই ব্যবস্থাকে একটি সঠিক নিয়মে বেঁধে তাতে কতগুলি বৈশিষ্ট্য যুক্ত করেন। আকবর সাম্রাজ্যের সামরিক ও বেসামরিক কাজকর্মের ভিত্তি হিসেবে ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে মনসবদারি প্রথা চালু করেন। 'মনসব’ কথাটির অর্থ হল ‘পদমর্যাদা’ বা Rank। এই পদমর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিরা ‘মনসবদার’ নামে পরিচিত।



মনসবদারি প্রথা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য : 


আকবর কর্তৃক মনসবদারি প্রথা প্রবর্তনের বিভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল। যেমন— 


রাজকর্মচারিদের সংগঠনঃ 

আকবরের পূর্বে মোগল রাজকর্মচারিদের সংগঠিত করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আকবর মোগল সামরিক ও বেসামরিক সরকারি কর্মচারিদের সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে মনসবদারি প্রথার প্রবর্তন করেন। 

 

জায়গিরদারদের দুর্নীতিঃ 

আকবরের পূর্বে প্রচলিত জায়গিরদারি প্রথার ফলে প্রশাসনে নানা দুর্নীতি প্রবেশ করে। শর্তানুযায়ী প্রতিটি জায়গিরদারকে যে নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা রাখতে হত তারা তা রাখতেন না। তাছাড়া যুদ্ধের সময় জায়গিরদাররা সম্রাটকে অকর্মন্য ও বৃদ্ধ সেনা ও ঘোড়া সরবরাহ করতেন। 


সরকারি আয় হ্রাসঃ 

জায়গিরদারি প্রথার ব্যাপক প্রসারের ফলে সম্রাটের ‘খালিসা’ জমির পরিমাণ কমে গিয়ে সরকারি আয় কমে যায়।  


জায়গিরদারদের ক্ষমতাঃ 

সুলতানি আমলের শেষদিকে জায়গিরদারি প্রথা বংশানুক্রমিক হয়ে গেলে নিজ নিজ এলাকায় জায়গিরদারদের ক্ষমতা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। কখনো কখনো তারা সম্রাটের বিরুদ্ধেই ক্ষমতা প্রদর্শন করেন। এসব কারণে আকবর জায়গিরদারি প্রথার অবাস ঘটিয়ে মনসবদারি প্রথা চালু করেন।



মনসবদারের দায়িত্ব : 

জাট ও সওয়ারঃ 

প্রত্যেক মনসবদারকে ‘জাট’ ও ‘সওয়ার’ বাহিনী রাখতে হত। ‘জাট’ ও ‘সওয়ার’ বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কারও কারও মতে, 'জাট' ছিল পদাতিক এবং ‘সওয়ার’ ছিল অশ্বারোহী বাহিনীর সূচক। অর্থাৎ প্রতিটি মনসবদার তাঁর পদমর্যাদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য রাখতেন এবং সম্রাটের সামরিক প্রয়োজনে সম্রাটকে পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতেন। 


দাগ ও হুলিয়া প্রথাঃ

আকবর ‘দাগ’ ও ‘হুলিয়া' প্রথার পুনঃপ্রবর্তন করে সেনাবাহিনীতে দক্ষ সেনা ও ঘোড়া রাখার ব্যবস্থা করেন। যে সকল মনসবদার বেশি সংখ্যক সওয়ার রাখতেন তাদের পুরস্কৃত করা হত।


বেসামরিক দায়িত্বঃ 

সামরিক দায়িত্ব ছাড়া মনসবদারদের বেশ কিছু বেসামরিক দায়িত্বও পালন করতে হত।


বিভিন্ন স্তরঃ 

কোনো মনসবদার কত সংখ্যক অশ্ব ও সৈন্য রাখবে তা আকবর নিজে নির্ধারণ করে দিতেন। মনসবদারদের সৈন্য ও অশ্ব সংখ্যার উপর ভিত্তি করে সমগ্র ব্যবস্থাটিকে ৩৩টি স্তরে ভাগ করা হত। মনসবদারগণ নিজ নিজ পদমর্যাদা অনুসারে সর্বনিম্ন ১০ জন থেকে সর্বোচ্চ ১২,০০০ সৈন্য পোষণের অধিকারী ছিলেন। এর মধ্যবর্তী স্থলে ২০, ১০০, ৫০০, ১০০০, ৫০০০, ৭০০০ ইত্যাদি পদের মনসবদার ছিলেন। সাধারণত উচ্চ মনসবদারের দায়িত্ব পেতেন সম্রাটের নিকটাত্মীয় ও বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিরা। মানসিংহ, ভগবান দাস, টোডরমল সাত হাজারি মনসবদারের পদ পেয়েছিলেন।



নিয়োগ, অপসারণ ও বেতনঃ

মনসবদারদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, অপসারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সম্রাটের ইচ্ছাই ছিল শেষ কথা। 


নিয়োগঃ 

বংশানুক্রমিকভাবে বা উত্তরাধিকারসূত্রে মনসবদারের পদ লাভ করা যেত না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল কর্মদক্ষতার। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে মনসবদারের পদ প্রদান করা হত।  


বেতনঃ 

মনসবদারদের বেতন দেওয়া হত কোনো কোনো ক্ষেত্রে নগদে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জায়গির প্রদানের মাধ্যমে। মনসবদারদের পর্যাপ্ত বেতন দানের ব্যবস্থা ছিল। একশো ‘জাট’ পদাধিকারী মনসবদার ৫০০ টাকা বেতন পেতেন। এক হাজারি ও পাঁচ হাজারি মনসবদারদের বেতন ছিল যথাক্রমে ৪,৪০০ ও ৩০,০০০ টাকা। এই বেতন থেকে মনসবদারকে তার সেনাদলের বেতন, হাতি ও ঘোড়া ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ভার বহন করতে হত। 


জায়গিরদারি প্রথার পুনঃপ্রবর্তনঃ 

আকবর অনেক মনসবদারকে নগদ বেতনের পরিবর্তে জায়গির দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এইভাবে মনসবদারি প্রথার মাধ্যমে পুনরায় জায়গিরদারি প্রথার সূচনা হয়। তবে এই সকল জায়গিরদাররা তাদের বেতনের সমপরিমাণ অর্থের বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারতেন না। জমির উপর তাঁর কোনো স্থায়ী অধিকার ছিল না। বংশানুক্রমিকভাবে প্রাপ্ত জায়গির ‘ওয়াতন জায়গির’ এবং স্থায়ী জায়গির ‘তখা জায়গির’ নামে পরিচিত। জায়গিরদারকে দু-চার বছর পরপর নিয়মিত বদলি করা হত। 


অপসারণঃ সম্রাট ইচ্ছা করলে যে কোনো সময় যে কোনো মনসবদারকে পদচ্যুত করতে পারতেন।


আকবরের পরবর্তীকালে মনসবদারি ব্যবস্থাঃ আকবরের পরবর্তী মোগল শাসকগণ মনসবদারি প্রথায় কিছু পরিবর্তন ঘটান। 


জাহাঙ্গীরঃ 

জাহাঙ্গীর ঘোড়সওয়ার সেনাদের ভরণ-পোষণের জন্য অর্থ বরাদ্দ হ্রাস করেন। এছাড়া তিনি 'দু-আসপা’ (দুই ঘোড়ার সওয়ারি) এবং ‘শি-আসপা’ (তিন ঘোড়ার সওয়ারি) প্রথা চালু করেন। 


শাহজাহানঃ

শাহজাহান প্রথমে মনসবদারদের অধীনস্ত মোট সেনাসংখ্যার অন্তত ১/৩ অংশ ও পরে অন্তত ১/৫ অংশ অশ্বারোহী সেনা রাখার নিয়ম করেন। 


ঔরঙ্গজেবঃ 

ঔরঙ্গজেব ‘দাগ’ ও ‘হুলিয়া’ প্রথায় নজরদারি বাড়ান। এসময় ‘দাগ’ পরীক্ষাকারী কর্মচারিদের কাছ থেকে মনসবদারদের বছরে দুবার সার্টিফিকেট নেওয়ার নিয়ম করা হয়।




প্রশ্ন-উত্তর


১. ভারতে মনসবদারি প্রথা কে প্রবর্তন করেন?

উঃ আকবর


২. মানসবদার অর্থ কি?

উঃ 'মনসব' অর্থ পদমর্যাদা, এই পদমর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিরা মানবদার নামে পরিচিত।


৩. জাট' ও 'সওয়ার' সংখ্যার ওপর নির্ভর করে মানসবদাররা কতগুলি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিলেন?

উঃ ৩৩ টি শ্রেণী


৪. দু আসপা শি আসপা বলতে কী বোঝো?

উঃ দু আসপা বলতে দুই ঘোড়ার সাওয়ারি এবং শি আসপা বলতে তিন ঘোড়ার সাওয়ারি বোঝায়।


৫. মনসবদারি প্রথা কবে চালু হয়?

উঃ ১৫৭৭ সালে।







একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad

Ads Section